
কাগজ ডেস্ক:বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইছামতিকে নিয়ে লিখেছেন এই আঁকাবাঁকা ইছামতী নদীর ভিতর দিয়ে চলেছি। এই ছোটো খামখেয়ালি বর্ষাকালের নদীটি-এই-যে দুই ধারে সবুজ ঢালু ঘাট, দীর্ঘ ঘন কাশবন, পাটের ক্ষেত, আখের ক্ষেত আর সারি-সারি গ্রাম-এ যেন একই কবিতার কয়েকটা লাইন, আমি বারবার আবৃত্তি করে যাচ্ছি এবং বারবারই ভালো লাগছে।
পদ্মার মতো বড়ো নদী এতই বড়ো সে যেন ঠিক মুখস্থ করে নেওয়া যায় না, আর এই কেবল ক’টি বর্ষা-দ্বারা অক্ষর-গোনা ছোটো বাঁকা নদীটি যেন বিশেষ করে আমার হয়ে যাচ্ছে। পদ্মানদীর কাছে মানুষের লোকালয় তুচ্ছ, কিন্তু ইছামতী মানুষ-ঘেঁষা নদী; তার শান্ত জলপ্রবাহের সঙ্গে মানুষের কর্মপ্রবাহের স্রোত মিশে যাচ্ছে। দীর্ঘবছর ভাগাড়ে পরিনত ও দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত হচ্ছে বলা যায় প্রাণ ফিরে পাচ্ছে মৃতপ্রায় ইছামতি নদী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে শুরু হয়ে খননকাজ ও দখলমুক্ত করা।
পাবনা ইছামতি নদীর দৈর্ঘ্য ৮৪ কিলোমিটার। প্রস্থ সর্বনিম্ন ১০০ মিটার এবং সর্বোচ্চ ১৪০ মিটার অর্থাৎ গড় প্রস্থ ১২০ মিটার। গভীরতা শহরাংশে পদ্মা হতে তৈলকুপি-জগনাথপুর বাঁধ পর্যন্ত ০২ মিটার; বর্তমানে এই অংশটুকু মরা নদী। অপর অংশ অর্থাৎ তৈলকুপি-জগনাথপুর বাঁধ থেকে পতিতস্থল বেড়া হুরাসাগর পর্যন্ত ৪ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত অর্থাৎ গড় গভীরতা ০৫ মিটার। নদী অববাহিকার আয়তন ৪৫০ বর্গকিলোমিটার। নদীটি মৌসুমি প্রকৃতির এবং ধরন বা বৈশিষ্ট্য সর্পিল আকার। ইছামতি নদী বন্যাপ্রবণ হলেও জোয়ার-ভাটার কোনো প্রভাব নেই। প্রবাহিত এলাকা পাবনা সদর উপজেলা, আটঘোরিয়া, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলাসমূহ। ইছামতি নদী ছিল পদ্মার সাথে যমুনা নদীর সংযোগ স্থাপন ও যোগাযোগের অন্যতম নৌপথ। এছাড়া মধ্যযুগে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ব্যবসায়-বাণিজ্য, নৌ-যোগাযোগ ও নৌবহর চলাচলের অন্যতম পথ ছিল পাবনা ইছামতি নদী। (ড. মো. মনছুর আলম, ইছামতি নদীর পূর্বাপর, পৃ. ৫৯-৬০)।
ইছামতি নদী দিয়ে অনেক অনেক সওদাগরী নৌকা, গয়নার নৌকা, বেদে বহর চলাচল করত। অত্যন্ত শান্ত সুশ্রী ইছামতি নদীর বক্ষে এক সময় শত শত পালতোলা নৌকা চলত। এছাড়া ভেলা, ডিঙি, বজরা, লঞ্চ, স্টিমার অবাধে চলাচল করত এই নদী দিয়ে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক স্মৃতি জড়িত এই নদীর সাথে। তিনি তাঁর জমিদারি দেখাশোনা করতে বজরা ভাসিয়ে পদ্মা নদী হতে ইছামতি নদীর বক্ষে প্রবেশ করতেন। ইছামতি নদীর সৌন্দর্য, ছোট ছোট ঢেউ, নদী পাড়ের ঘাসফুল-কাশফুল সবুজ-শ্যামল স্নিগ্ধ প্রকৃতি, নব বধূদের জলকেলি, শিশু-কিশোরদের দাপাদাপি সবই বজরায় বসে উপভোগ করতেন।
ইছামতি নদীর এই রূপে-সৌন্দর্যে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন যে, তিনি মনের অজান্তেই গেয়ে চলেছেন- জলের উপর ঝলোমলো টুকরো আলোর রাশি ঢেউয়ে ঢেউয়ে পরীর নাচন, হাততালি আর হাসি। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ইচ্ছামতী’, পৃ. ৩২৯)। বিশ্বকবি ইছামতি নদী হয়ে শাহজাদপুর জমিদারি জমিদারিতে যাতায়াত করতেন। আবার কখনও কখনও শাহজাদপুর হতে নওগাঁ পতিসর জমিদারিতেও যেতন। তাই শুধু ইছামতি নদীই নয় তিনি তাঁর বিভিন্ন লেখায় পাবনা অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদী এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ৩ আষাঢ় ১২৯৮ (১৬ জুন ১৮৯১) সালে শাহজাদপুর কাছারি বাড়ি থেকে ইন্দিরা দেবীকে লেখা পত্রে এ এলাকর নদী এবং প্রাকৃতির সুন্দর বর্ণনা পাওয়া যায়।
এছাড়া ২৩ জুন ১৮৯১ তারিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ এলাকার নদী ও প্রাকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরে ইন্দিরা দেবীবে লেখেন, “আজকাল দুপুর বেলাটা বেশ লাগে। রৌদ্রে চারিদিক বেশ নিঃঝুম হয়ে থাকে-মনটা ভারি উড়ু উড়ু করে, বই হাতে নিয়ে আর পড়তে ইচ্ছে করে না। তীরে যেখানে নৌকা বাঁধা আছে সেইখান থেকে এ রকম ঘাসের গন্ধ এবং থেকে থেকে পৃথিবীর একটা গরম ভাপ গায়ের উপরে এসে লাগতে থাকে- মনে হয় যেন এই জীবন্ত উত্তপ্ত ধরণী আমার খুব নিকট থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে- বোধ করি আমারো নিঃশ্বাস তার গায়ে গিয়ে লাগছে। এক সময়ের আশীর্বাদ ইছামতি দখল আর দূষণে এখন আবর্জনার ভাগাড়; পরিণত হয়েছে দুর্ভোগের আরেক নামে। আন্তর্জাতিক নদী দিবসে ইছামতিকে পুনরুজ্জীবিত করে আগের খরস্রোতা রূপে ফিরে পাওয়ার দাবি পাবনাবাসীর।
১৬০৮ সালে বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁর শাসনামলে সৈন্য পরিচালনার সুবিধার্থে পদ্মা ও যমুনা নদীর সংযোগ স্থাপনে একটি খাল খনন করা হয়। এই খালই পরে ইছামতি নাম ধারণ করে। এ নদীকে ঘিরেই গড়ে ওঠে পাবনা শহর। আর এই ইছামতি দিয়েই কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ী থেকে শাহজাদপুরের কাচারি বাড়িতে যেতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথের সাথে পাবনার সম্পর্ক :
রবীন্দ্রনাথ ও পাবনা এই দুটি নামই একে অপরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। বিশ্বকবির বহু লেখায় এই অঞ্চলের নাম বারবার উঠে এসেছে।এমনকি একটি লেখায় তো বিশ্বকবি এ জেলায় বসতি স্থাপনের আকুলতাও ব্যক্ত করে ফেলেছেন। বিশ্বকবির ভাষায়-‘পাবনায় বাড়ি হবে গাড়ি গাড়ি ইট কিনি/রাধুঁনি মহল-তরে করোগেট-শীট কিনি।’ পাবনার স্নিগ্ধ প্রকৃতি, মানুষ এবং এখানকার জনজীবনকে তিনি পরমাত্মীয় জ্ঞানে আপন করে নিয়েছিলেন।পদ্মায় নাও চালনারত নিরক্ষর মানুষদের কণ্ঠের গানঃ ‘যুবতী ক্যান বা কর মন ভারী/পাবনা থ্যাহা আন্যা দেব ট্যাহা দামের মোটরী।’ এ লাইন দুটির মাধ্যমে তিনি পাবনার পল্লী জীবনের এক রূপচ্ছবি তুলে ধরেছেন।এখানকার মাটি ও মানুষের নিবিড় সান্নিধ্যে বসে তিনি রচনা করেছেন বিভিন্ন ছোটগল্প, কবিতা,নাটক,প্রবন্ধ এবং পত্রসাহিত্য। শুধু তাই নয় কবিগুরু বারবার সেই ভালোবাসার টানে ছুটে এসেছেন এই প্রান্তরে।
পূর্ববঙ্গ তথা পাবনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য। জমিদারি দেখাশোনা (১৮৯০-১৮৯৭), কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলন (১৯০৮), উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সম্মিলন (১৯১৪) প্রভৃতি উপলক্ষে তিনি অনেকবার পাবনায় এসেছেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কাটিয়েছেন এখানকার নিভৃত পল্লীতে।
১৯১৪ সালের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি (রবিবার ও সোমবার) পাবনা শহরে দুই দিনব্যাপী ‘উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সম্মিলনে’র সপ্তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরী ও নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়ের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংবর্ধনা নিতে রাজি হয়েছিলেন। রবীন্দ্র জীবনীকার প্রশান্ত পাল লিখেছেন : ‘এই সম্মেলনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন আশুতোষ চৌধুরী ও মূল সভাপতি নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়—দুই বন্ধুর নির্বন্ধাতিশয্যে তাঁকে পাবনা যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিতে হয়।’ নির্দিষ্ট তারিখে প্রমথ চৌধুরী ও মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ পদ্মা বোটে চড়ে পাবনা পৌঁছেন। পাবনায় এসে প্রথমেই তিনি শীতলাই জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রের বাড়ি ‘শীতলাই হাউসে’ আতিথ্য গ্রহণ করেন। প্রথম দিনের অনুষ্ঠান শেষেও কবি রাতযাপন করেন শীতলাই জমিদার বাড়িতেই।
সম্মেলন হয় বেলা দুটোয়, পাবনা ইনস্টিটিউশন চত্বরে। সভায় সভাপতিত্ব করেন নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়। এরপর একে একে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণ, সভাপতি-নির্বাচন, সভাপতির ভাষণ ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতির ডানপাশে আসন গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে সভাপতির অনুমতিক্রমে ‘সুরাজ’ পত্রিকার সম্পাদক কিশোরী মোহন রায় রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে আনন্দ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অধ্যাপক পঞ্চানন নিয়োগী সে-প্রস্তাব সমর্থন করেন। পাবনা সাহিত্য-সম্মিলনে সংবর্ধনার জবাবে রবীন্দ্রনাথ যে-ভাষণ পাঠ করেছিলেন তা ‘মানসী’ পত্রিকার বৈশাখ, ১৩২১ সংখ্যায় ছাপা হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৪ (সোমবার) রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য অতিথি পাবনা কলেজের (বর্তমান সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ) নবনির্মিত ভবন পরিদর্শন করেন। উল্লেখ্য, সম্মিলনের কেন্দ্রস্থল পাবনা ইনস্টিটিউশনের একটি কক্ষে যাত্রা শুরু করেছিল আজকের সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ। এদিকে সাহিত্য-সম্মিলনের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনের পর বেলা ২টায় সভা শুরু করে বিকাল ৫টায় শেষ করা হয়। ৫টার পরে উদ্যান-সম্মিলন ছিল বলে সভা দ্রুত শেষ করতে হয়েছিল। দুপুরের সভায় প্রবন্ধাদি পাঠের পর অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্য-সম্মিলন পরিচালনা বিষয়ে কিছু উপদেশ দিতে অনুরোধ করেন।
পাবনা সাহিত্য-সম্মিলনে সংবর্ধনা গ্রহণ শেষে ১৯১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে ফিরে যান এবং টমসনকে লেখেন : ‘I was dragged to Pabna to take part in a litetary conference. It is over now and I am allowed to come back to my retreat where I am hiding at present.’
পাবনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের নানা যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি জমিদারি তদারকির জন্য ১৮৯০ সালে সর্বপ্রথম তৎকালীন পাবনা জেলার সাজাদপুরে আসেন এবং ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে সেখানে বসবাস করেন। এরপর ১৯০৮ সালে পাবনায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেন।
১৯১৪ সালে পাবনায় অনুষ্ঠিত ‘উত্তরবঙ্গ সাহিত্য-সম্মিলনে’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তা ছাড়া পাবনার হরিপুরের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার-সূত্রে রবীন্দ্রনাথ বহু বার পাবনায় এসেছেন। তাঁর অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা ইন্দিরা দেবীর বিয়ে হয়েছিল পাবনার ভূমিপূত্র প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে। প্রমথ চৌধুরীর অগ্রজ ব্যারিস্টার আশুতোষ চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের বোন প্রতিভা দেবীর। পাবনার প্রকৃতি ও মানুষ তথা এখানকার পদ্মা, যমুনা, ইছামতি, বড়াল, হুরাসাগর, নাগর প্রভৃতি নদীর সঙ্গে তাঁর প্রাণের বন্ধন স্থাপতি হয়েছিল। সর্বোপরি পাবনায় রবীন্দ্র-সংবর্ধনা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় ঘটনা। যার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে পাবনার পরিচিতি আরও নতুন মাত্রা লাভ করে।
Leave a Reply