
অনলাইন ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি ফেরত চাইছেন তিনি। তার ভাষায়, আমরা সেই ঘাঁটিটি ফেরত চাই—যেটি চীনের পারমাণবিক অস্ত্র কারখানার কাছেই, কৌশলগত জায়গায় অবস্থিত।
এই ঘোষণার পরই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও কূটনৈতিক উত্তেজনার নতুন তরঙ্গ। কী আছে বাগরামে? কেন হঠাৎ করে আবারও এই ঘাঁটি ফিরে পেতে মরিয়া ট্রাম্প?
কাবুল থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত বাগরাম বিমানঘাঁটি ছিল প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতার প্রাণকেন্দ্র। সোভিয়েত যুগে নির্মিত হলেও, ২০০১ সালের ৯/১১-র পর এটিকে পরিণত করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের মূল ঘাঁটিতে।
শীর্ষ নিরাপত্তা সুবিধা, ৩.৬ কিমি দীর্ঘ রানওয়ে, সামরিক বিমান ওঠানামার উপযোগী অবকাঠামো, কারাগার, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও রসদ সরবরাহের জন্য সুপরিকল্পিত লজিস্টিক ব্যবস্থা—সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল এক কথায় ‘মিনি-আমেরিকা’।
বাগরামে একসময় এক লাখেরও বেশি মার্কিন সেনা অবস্থান করত। এমনকি সেখানে ছিল বার্গার কিং ও পিৎজা হাটের মতো মার্কিন ব্র্যান্ডের রেস্তোরাঁও।
ট্রাম্প মনে করছেন, বাগরাম ঘাঁটির গুরুত্ব শুধু আফগানিস্তান নয়, বরং এর কৌশলগত অবস্থান চীনের উপর নজরদারি চালানোর জন্য উপযুক্ত। তার ভাষায়, চীনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জায়গা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত বাগরাম।
যদিও ট্রাম্পই তার প্রথম মেয়াদে তালেবানের সঙ্গে দোহা চুক্তি করে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের রূপরেখা নির্ধারণ করেন, তবুও তিনি দাবি করছেন—বাগরাম ঘাঁটি পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের পরও যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন।
বাগরাম ফিরে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে আবেদনময় হলেও, বাস্তবিক দিক থেকে তা অত্যন্ত কঠিন। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাঁটি পুনর্দখল করতে হলে ১০,০০০-এরও বেশি সেনা, উন্নত এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা ও জটিল কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োজন।
তার ওপর তালেবান সরকার ইতিমধ্যে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—আফগানিস্তানের মাটিতে কোনো বিদেশি ঘাঁটি থাকবে না।
চীন ইতোমধ্যে বাগরাম নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেন, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আফগান জনগণ।
এই অবস্থায় বেইজিং, মস্কো ও তেহরান চাইবে না যুক্তরাষ্ট্র আবার এই অঞ্চলে সক্রিয় হোক। কারণ একবার বাগরাম ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে এলে মধ্য এশিয়া থেকে ইউরেশিয়া পর্যন্ত আমেরিকার নজরদারি আরও বিস্তৃত হয়ে যাবে।
বাগরাম ফিরে পেতে ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক বার্তা বহন করলেও, এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জটিল ও বিপজ্জনক। এটি কেবল আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়—বরং একটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত লড়াইয়ের অংশ।
সামনে ২০২৫-এর মার্কিন নির্বাচনের আলোকে ট্রাম্পের এ বক্তব্য হয়তো তার নির্বাচনী প্রচারের কৌশল, তবে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে কাবুল থেকে বেইজিং পর্যন্ত।
বাগরাম ঘাঁটি এখন কেবল একটি সামরিক স্থাপনা নয়, বরং বিশ্বশক্তির ভারসাম্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি কার দখলে থাকবে, সেটাই নির্ধারণ করবে এশিয়ার ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক রূপরেখা।
Leave a Reply