
নিজস্ব প্রতিবেদক : কাঠের শিল্পে বদলে গেছে গ্রাম। যশোর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার গেলেই তেঘরিয়া গ্রামের অবস্থান। সদরের এই গ্রামে অধিকাংশ মানুষ এখন কাঠ শিল্পের সাথে জড়িত। এই শিল্পে ভাগ্য বদলে গেছে পাঁচ শতাধিক পরিবারের। গ্রামের সবচেয়ে পরনো কাঠের শিল্পের কারখানা সুবোধ কুমার রায়ের। বলা চলে গ্রামে তিনিই গোড়া পত্তন করেছিলেন এ শিল্পের। এসব কারখানায় কর্মসংস্থানের সুযোগ হওয়ায় বদলে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এই গ্রাম থেকে বছরে পাঁচ কোটি টাকার বেশি কেনাবেচা হয়।
২০১২ সালে সুবোধ কুমার রায় কারখানাটি গড়ে তোলেন। প্রথমদিকে তিনি কাঠের আসবাবপত্র তৈরির কাজ করতেন। তার কারখানা থেকে অন্তত ৫০ জন কাজ শিখে কারখানা করেছেন বা অন্যের কারখানায় কমিশনে কাজ করছেন।
তার সাথে কমিশনে কাজ শুরু করেন একরামুল হোসেন। তিনি ৩৪ বছর ধরে তাঁতের গামছা বুননের কাজ করেছেন। বর্তমান বাজার না থাকাই সংসার চালাতে তিনি হিমশিম অবস্থায় পড়েন। যে কারণে ৫২ বছর বয়সে তিনি পেশা বদল করে কাঠের খুন্তি, চামচ, লেবু চাঁপা, ডাল ঘোটা তৈরি করে নিজের ভাগ্য বদল করেন। এখন নিজের একটি কারখানা রয়েছে। তার কর্মসংস্থানের পাশাপাশি কারখানায় নারী-পুরুষ মিলে এখন ১৫ জন কাজ করেন।
সুবোধ কুমার রায়ের কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, কারখানার দুইটি অংশ। একাংশে কাঠ কেটে সাইজ করে অন্য অংশে পাঠানো হচ্ছে। সেখানেই নকশা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। খুন্তি চামচ তৈরি করে রাখা হচ্ছে। সেগুলো আবার বান্ডিল করে গ্রামের নারীরা বাড়িতে নিয়ে পালিশের কাজ করেন।
একরামুল হোসেনের কারখানায় গিয়ে দেখা গেল, একরামুলসহ চারজন কারিগর চারটি যন্ত্রের সাহায্যে কাঠের চামচ ও খুন্তি তৈরির কাজ করছেন। একরামুল হোসেন বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৫৯ বছর। এর মধ্যে ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩৪ বছর তাঁতের গামছা-লুঙ্গি বুনুনের কাজ করেছি। শেষ দিকে যে টাকা আয় হত তাতে সংসার চালানো যেত না। বাধ্য হয়ে এই গ্রামের সুবোধ রায় বাবুর কারখানায় গিয়ে কাজ শিখে নিজেই কাঠের খুন্তি-চামচ তৈরির কারখানা করলাম। প্রথমে আমার তৈরি খুন্তি-চামচের ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয় আমার এক ভাতিজা। এরপরে অর্ডার আসতে থাকে। এভাবেই এই ব্যবসা শুরু হয়।’
তিনি আরও জানান, সুবোধ বাবুর কারখানায় কাজ শিখে সেখানে উৎপাদনের কমিশনে কাজ করতাম। এরপর ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে একটা মেশিন দিয়ে নিজে কাজ শুরু করি। এখন আমার কারখানায় আটটি যন্ত্র আছে। এসব যন্ত্রে ৮ জন কাজ করেন। পাশাপাশি গ্রামের নারীরা উৎপাদিত চামচ-খুন্তিসহ বিভিন্ন পণ্যে পালিশের কাজ করেন।
প্রায় ৩০ জন উদ্যোক্তা এই গ্রামে কাঠের খুন্তি, চামচ, লেবু চাঁপা, ডাল ঘোটা, কাঠের চিরুনিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করছেন। তেঘরিয়া গ্রামে গড়ে উঠেছে এসব পণ্য তৈরির ২৬ টি কারখানা। কেউ কেউ যৌথভাবে কারখানা গড়ে তুলেছেন। এসব উৎপাদিত পণ্য ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠানো হয়। এই কুটির শিল্পে নারী শ্রমিকও কাজ করেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ হওয়ায় বদলে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এই গ্রাম থেকে বছরে পাঁচ কোটি টাকার বেশি কেনাবেচা হয়। তবে পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী তারা উৎপাদন করতে পারেন না। কারণ ঠিক মত বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না। কারখানাগুলো বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল।
এই কারখানায় কাজ করেন প্রদীপ ভাস্কর। তিনি বলেন, ‘আমি কাটিং কারখানায় উৎপাদনের উপর কমিশনে কাজ করি। তাতে মাসে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়। নিজের গ্রামে বসেই মাসে ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করা সত্যিই খুব সৌভাগ্যের বিষয়। এই গ্রামের মানুষ এখন কাঠের কাজের উপর অনেকটা নির্ভরশীল।’
কারখানা মালিক সুবোধ কুমার রায় বলেন, ‘আগে থেকেই আমি কাঠের আসবাবপত্র তৈরির কাজ করতাম। পরে চিন্তা করলাম বয়স বাড়ছে নিজে কোন কারখানা করলে শেষ বয়সে বাড়িতে বসেই দেখভাল করা যাবে। সেই সাথে গ্রামের নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যে কারণে ১৪ বছর আগে এই কারখানা স্থাপন করেছি। এখন আমার কারখানায় ৩০ জন নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। বছরে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকার পণ্য ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটে পাঠানো হয়। আমার কারখানার পণ্যের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারি না। কারণ ঠিক মত বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যায় না। বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের এই কাজ করা সম্ভব নয়। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হলে বছরে ৫০ লাখের বেশি পণ্য পাঠানো যেত।’
এই গ্রামের সবচেয়ে বড় কারখানা এখন দিলীপ কুমার দাশের। তার কারখানায় অন্তত ৪০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনিও প্রায় ৫০ লাখ টাকার পণ্য পাঠান বলে জানান দিলীপ কুমার।
একরামুল হোসেন, সুবোধ কুমার রায়, দিলীপ দাসের পাশাপাশি রমেশ রায়, অমল রায়, মনি গোপাল, সুজন রায়ের মতো উদ্যোক্তারা এই কুটির শিল্প স্থাপনে এগিয়ে এসেছেন।
তেঘরিয়া গ্রামে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান ভালো, দামও স্বল্প। যে কারণে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এই গ্রামের কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য নিতে বেশি আগ্রহী।
ঢাকার পাইকারি ব্যবসায়ী মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘যশোরের মতো কাঠের খুন্তি-চামচ অন্য কোথাও পায়নি। তাছাড়া যশোরের সুবোধ কুমার রায়ের কারখানা থেকে প্রতি মাসে অন্তত দুই লাখ টাকার পণ্য পাইকারি কিনে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করি। ওই কারখানার পণ্যের গুণগত মান ভালো, দাম স্বল্প।’
ঢাকার আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যশোর থেকে পণ্য নিয়ে আমি নরসিংদী, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ দেশে বিভিন্ন জেলায় পাঠায়’।
উদ্যোক্তা ও শ্রমিকরা বলেন, ‘মূলত মেহেগনি কাঠ দিয়ে এসব পণ্য তৈরি হয়। মান বাড়াতে নিম ও শিশু কাঠ ব্যবহার করা হয়। বিশেষ অর্ডার এর ক্ষেত্রেই এই কাঠ ব্যবহার করা হয়’।
এই কুটির শিল্পের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মূলধন, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে এই শিল্পটি দেশের অর্থনীতিতে আরো অবদান রাখতে পারবে।
উদ্যোক্তারা বলেন, এই কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের মূলধনের অভাব রয়েছে। এই গ্রামে অনেক এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে। চড়া সুদে উদ্যোক্তাদের এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। সহজ শর্তে কম সুদে সরকার ঋণ দিলে উদ্যোক্তারা আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে। এছাড়া নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক এজাজ উদ্দিন টিপু জানান, যশোরে বিভিন্ন ধরণের কুঠির শিল্পে কাজ হয়ে থাকে। অথচ তারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পায়না। বিসিক কর্মকর্তারাও তাদের খোঁজ রাখেনা। তাদেরকে সহযোগিতা করলে কুঠির শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এতে করে বাড়বে কর্মসংস্থান। বদলে যাবে গ্রামীল অর্থনীতি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উপ মহব্যবস্থাপক এনাম আহমেদ জানান, উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে স্বল্প সুদে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব কারখানা বিসিক থেকে নিবন্ধন নিলে বিদ্যুৎ বিল বাণিজ্য রেট থেকে শিল্প রেটে স্থানান্তরের সুযোগ রয়েছে। এতে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে। এছাড়া নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যে বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করা হবে।
তিনি আরও জানান, খুব শিগগির কারখানাগুলো পরিদর্শন করে কুটির শিল্পের সুবিধার আওতায় আনা হবে।
Leave a Reply