
আ: মালেক রেজা, শরণখোলা ( বাগেরহাট) : পৃথিবীর অন্যতম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এর উপর নির্ভরশীল হাজার হাজার জেলে বাওয়ালি ও মৌয়ালরা। প্রতিবছর সরকার শুটকি পল্লী সহ বিভিন্ন খাত থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে।
সুন্দরবনে আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুবাহিনী।গত ছয় বছর আগে আত্মসমর্পণকারী এবং নতুনভাবে সংগঠিত দল মিলিয়ে অন্তত ২০টি দস্যু বাহিনী এখন সুন্দরবন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা , চাঁদপাই ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্নএলাকায় তাদের দৌরাত্ম বেশি। এসব দস্যুরা জেলেসহ বনজীবিদের অপহরণ করে মোটা অংকের মুক্তিপণ আদায় করছে । গত একমাসে শতাধিক জেলে অপহরণ করে লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপন আদায় করেছে তারা। এতে জেলে ও তাদের পরিবার, বনজীবী ও ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।জেলেও বনজীবিরা দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে।
মৎস্য ব্যবসায়ী জেলেদের সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া তিন শতাধিক জেলে বনদস্যুদের হাতে আটক অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত সেপ্টেম্বর শতাধিক জেলেকে জিম্মি করে বনদস্যুরা। এর মধ্যে অনেকেই গোপনে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে ফিরে এসেছে। এখনও বিভিন্ন বাহিনীর হাতে জেলেরা জিম্মী আছে বলে জানান মৎস্য ব্যবসায়ীরা। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের মরা ভোলা,আলী বান্দা,ধঞ্চে বাড়িয়া, তেঁতুল বাড়িয়া, টিয়ার চর, আন্ধারমানিক,পশুর, শিবশাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলদস্যুদের বিচরণ বেশি। দস্যুরা বিভিন্ন নামে দল গঠন করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। আগের আত্মসমর্পণকারী বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এগুলো। এসব বাহিনীদের মধ্যে জাহাঙ্গীর বাহিনী, মনজুর বাহিনী, দাদা ভাই বাহিনী অস্ত্র ও সদস্য সংখ্যায় বেশিও দুর্ধর্ষ। এই তিন বাহিনীর সদস্যরা আগে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবন জীবনে ফিরে গিয়েছিল। এছাড়া করিম- শরিফ বাহিনী, আসাদুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবি বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, রাঙ্গাবাহিনি, সুমন বাহিনী, আনোয়ারুল বাহিনী, হান্নান বাহিনী ও আলিফ বাহিনীর নাম উল্লেখযোগ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বনসংলগ্ন এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি দস্যুদের মধ্যস্থতাকারী ও সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। তারা অপহৃত হয়ে জিম্মি থাকা জেলেদের পরিবার ও তাদের মহাজনদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে চাঁদার টাকা আদায় করে দস্যু বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। বিভিন্ন দস্যু বাহিনী নিজ নিজ সংকেত বসানো টোকেন দিচ্ছে জেলেদেরকে। জলদস্যুর দেওয়া টোকেন সঙ্গে নিয়ে সুন্দরবনে যেকোনো জায়গায় মাছ ধরলে তারা নিরাপদ থাকে। টোকেনের মাধ্যমে সুন্দর বনে মাছ ধরার অনুমতি পায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শরণখোলার একাধিক মাছ ব্যবসায়ী জানান, দস্যুদের বিরুদ্ধে কোন কথা বলা নিরাপদ নয়। বনের পাশে জেলে মৎস্য আরতের আশে-পাশে দস্যুদের প্রতিনিধি বা সোর্স ঘোরাফেরা করে। তথ্য ফাঁসের বিষয়ে জানতে পারলে পরবর্তিতে বনে গেলে জেলেদের উপরে বাড়ে নির্যাতন ও চাঁদার অংক। এই ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে জেলে বা মহাজন কেহই মুখ খুলছেন না। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য বনে জেলেদের পাঠালে নৌকা প্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। অপহরণের ঘটনায় মুক্তিপণ হিসেবে দিতে হয় ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।
কোস্টগার্ড মংলা পশ্চিম জোনের একটি সূত্রে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সুন্দরবনের দস্যুদের উৎপাত শুরু হয়েছে। এরপর থেকে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। দস্যু দমনে অভিযান এবং তাদের অবস্থান সনাক্তকরণে গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে। গত তিন অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ২৭ টি অভিযান পরিচালনা করেছে কোস্টগার্ড। এসব অভিযানে রাঙ্গা বাহিনীর প্রধান সহ ৪৪ জন বনদস্যু এবং তাদের সহযোগীদের আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে দেশি-বিদেশি ৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র ৪৩ টি বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র। বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম। ১৭০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৩৬৯ টি ফাঁকা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। বনদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা ৪৮ জেলেকে উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সুন্দর সুন্দরবন সংলগ্ন সাউথখালী ইউনিয়নের তাফালবাড়ি স্কুল এন্ড কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল মালেক রেজা বলেন, দস্যু দমনে র্যাব কোষ্টগার্ড ও পুলিশ বাহিনী
যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করলে সুন্দরবন থেকে বনদস্যুদের তাড়ানো সম্ভব এছাড়া বন বিভাগের নৌযান, জনবল ও ভারী অস্ত্র না থাকায় তাদের পক্ষে দস্যু নির্মূল করা সম্ভব হবে না বলে তিনি মনে করেন।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনে যে ভাবে দস্যুদল হানা করতে শুরু করেছে তাতে শুটকি মৌসুমে দুবলা সহ বিভিন্ন চরে তাদের নির্ধারিত রেভিনিউ যে ৮ কোটি টাকা আদায় করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে তা ব্যাহত হতে পারে। তিনি দস্যু দমনে ঊর্ধ্বতন মহলকে বিষয়টি অবহিত করেছেন।
শরণখোলা উপজেলা বিএনপির নবনির্বাচিত সভাপতি বেলাল হোসেন মিলন বলেন জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন জেলখানায় বন্দি থাকা চিহ্নিত অপরাধী দাগি আসামি ও অনেক আত্মসমর্পণকারী বনদস্য জেল থেকে অস্ত্র সহ পালিয়ে গেছে তারা এখন গোটা সুন্দরবন চষে বেড়াচ্ছে। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত করতে তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছেন। তা না হলে উপকূলীয় অঞ্চলে বেকারত্ব ও দারিদ্রতা দেখা দিবে।
সুন্দরবন খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষায় বন বিভাগের দায়িত্ব অপরিসীম বাঘ, হরিণ সহ সকল বন্যপ্রাণী রক্ষা করা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু যে সকল দস্য বাহিনী সুন্দরবনে রয়েছে তাদের দমন করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে র্যাব , কোস্টগার্ড এদের উপর সরকার ন্যস্ত করেছেন। আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।
Leave a Reply