
যশোর প্রতিনিধি : “পিঠা বাংলার ঐতিহ্য, পিঠা হোক বাংলাদেশের জাতীয় খাবার” স্লোগানে শিক্ষার্থীদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির সফল প্রকল্প ‘আইডিয়া পিঠা পার্ক’ এর ৮ বছর পূর্তি এবং ৯ম বছরে পদার্পণ উপলক্ষে শনিবার আয়োজিত হলো প্রাণবন্ত উৎসব ‘পিঠা পার্বণ-২০২৫’। শীতকে বরণ করে নেওয়ার এ আয়োজনে ছিল বাঙালিয়ানার ছোঁয়া, সৃজনশীলতা ও আনন্দের মেলবন্ধন।
উৎসবের পুরো পরিবেশ সাজানো হয়েছিল গ্রামীণ আমেজে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী পিঠা, রঙিন আলোকসজ্জা আর খেঁজুরের পাতা, হাতপাখা, কুলো দিয়ে মনোমুগ্ধকর সাজসজ্জা যেন উপস্থিত সবাইকে নিয়ে গিয়েছিল এক অন্য রকম গ্রামীণ উৎসবের আমেজে। আয়োজনে ছিল নানা ধরনের পিঠার প্রদর্শনী ও বিক্রয়, সাংস্কৃতিক পর্বে পরিবেশিত হয় কবিতা, পুঁথিপাঠ, নাচ, গান, আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল রম্যবিতর্ক “পিঠার রাজ্যে আমিই সেরা” — যেখানে অংশগ্রহণকারীরা হাস্যরসের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন বাঙালির প্রিয় ঐতিহ্য নানান ‘পিঠা’-কে ঘিরে নানা মজার দিক।
২০১৭ সালে শিক্ষক হামিদুল হক এর উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘আইডিয়া পিঠা পার্ক’ আজ দেশের অন্যতম সৃজনশীল উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। এটি কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের আত্মনির্ভরতার অনন্য উদাহরণ। বর্তমানে চারজন উদ্যোক্তার তত্ত্বাবধানে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে পরিচালিত এই প্রকল্পের লভ্যাংশের এক-পঞ্চমাংশ নিয়মিতভাবে ব্যয় করা হয় সমাজকল্যাণমূলক কাজে। চার উদ্যোক্তার মধ্যে আছেন সোমা খান, তানজিয়া জাহান, জান্নাতুল ফেরদৌস, নাবিলা সুলতানা।
যদিও এর প্রতিষ্ঠাতা হামিদুল হক (সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর) এখান থেকে কোন অর্থ অদ্যাবধি গ্রহণ করেন নি এবং লিখিত ভাবেই এর সম্পূর্ণ মালিকানা তিনি শিক্ষার্থীদের দিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন – “একসময় চিংড়ি যে আমাদের হোয়াইট গোল্ড হবে এটা কেউ জানতো না, আমাদের তৈরী পোশাক শিল্প রেমিট্যান্স আনবে তাও জানতো না – কিন্তু হয়েছে। একইভাবে আমার দেশের ভাপা পিঠা, ছিটারুটি, কুলি, চিতই – এর মাঝেও আছে অপার সম্ভাবনা! পিঠা আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতায় এটিই হতে পারে লাখো তরুণের স্বনির্ভর হওয়ার অংশ।”
আইডিয়া পিঠা পার্ক এর কোর্ডিনেটর সোমা খান বলেন, “প্রথমে অনেকেই আমাদের পাগল বলেছে, অবিশ্বাস করেছে। আমরা শুধু স্যার কে বিশ্বাস করে কাজ করে চলেছি। এখন আলহামদুলিল্লাহ পুরো দেশ জানে আইডিয়া পিঠা পার্ক এর নাম।” আরেকজন উদ্যোক্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “এখন যশোরের সরকারি বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান তাদের নাস্তায় পিঠা নেন। নানান কোম্পানি উর্ধতন কর্মকর্তা দের উপহার স্বরূপ আইডিয়া পিঠা পার্ক এর পিঠার ডালা নেন উপহারে। আমাদের প্রাপ্তি – আমরা হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারছি!” উদ্যোক্তা তানজিয়া জাহান বলেন, “শুরু থেকেই এর সম্পূর্ণ মালিকানা কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি লভ্যাংশের এক পঞ্চমাংশ যায় আর্ত-মানবতার সেবায়, যা দিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা সমাজের জন্য ভালো কাজ করছি।”
অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন আরেক উদ্যোক্তা নাবিলা সুলতানা, তিনি বলেন- “পিঠা পার্ক এখন শুধু দেশের মধ্যেই নয় বরং বিদেশেও রপ্তানি করছে বাংলার পিঠা।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ডা আবু হাসনাত মো আহসা হাবিব (অধ্যক্ষ, যশোর মেডিকেল কলেজ); অধ্যাপক ডা: মো হুসাইন শাফায়াত (তত্ত্বাবধায়ক, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, যশোর), ড খ ম রেজাউল করিম (সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর), মোছা পারভীন সুলতানা (সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর), জাহিদ মাহমুদ (অধ্যক্ষি, হাটহাজারী সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম), ফকির আকতারুল আলম (লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত রিজিওনাল গেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক), খান মাসুম বিল্লাহ (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, শিক্ষা ও আইসিটি), ডা মো মাসুদ রানা (সিভিল সার্জন যশোর) এছাড়াও বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির সম্মানিত অতিথি সহ যশোর জেলার সুহৃদ মহল ও সম্মানি গণমাধ্যম কর্মীবৃন্দ।
উৎসবে উপস্থিত বক্তারা বলেন, “আইডিয়া পিঠা পার্ক শুধু একটি পিঠা ব্যবসা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেওয়ার একটি মঞ্চ।”
আয়োজনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি পিঠা ও পরিবেশনার মাধ্যমে প্রমাণ করেন—যদি সুযোগ ও দিকনির্দেশনা মেলে, তবে তরুণরাই পারে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে, পাশাপাশি রক্ষা করতে পারে দেশের আপাত অযত্নে পড়ে থাকা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি কে।
পিঠার সুবাস, হাসির কলরোল আর আনন্দমুখর পরিবেশে শেষ হয় আইডিয়া পিঠা পার্কের ৮ বছর পূর্তির উৎসব—যা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়, বরং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির এক প্রেরণার গল্প।
Leave a Reply