
যশোর প্রতিনিধি : সংঘর্ষের পর যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) ক্যাম্পাস ও ঘটনাস্থল আমবটতলা মোড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলেও হয়নি কোন ক্লাস-পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের মাঝে আতংক বিরাজ করায় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণাও ছিলো কম। সংঘর্ষের সূত্রপাত নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্তকারী দোকান মালিক মুনায়েমকে আটক করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ঘটনার পর থেকে বাজারের অধিকাংশ দোকান বন্ধ রয়েছে। অনেকেই গ্রেফতার আতংকে দোকান বন্ধ রেখেছেন। ক্যাম্পাস কিংবা বাজারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন না থাকলেও পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে একট্টা গ্রামবাসী। অনেক শিক্ষার্থী আমবটতলাতে এসে চা খেয়েও টাকা দেয় না বরং ঝারি মারে। বাজারের এক দোকানদারকে শিক্ষার্থীরা মেরেছে; সেটার প্রতিবাদ করায় ছাত্ররা আগে হামলা করেছে। ঘটনার পর যে দোকানদারের সঙ্গে বিরোধ ছিলো পুলিশ তাকে আটক করেছে। এখন বাজারে একধরণের গ্রেফতার আতংক বিরাজ করছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার (২৪ নভেম্বর) যবিপ্রবির এক নারী শিক্ষার্থী আমবটতলা বাজারে মুনায়েম হোসেন নামে এক মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকানে যান। দোকানে তার মোবাইল সিম কার্ড খুলতে যেয়ে হাত কেটে ফেলেন শিক্ষার্থী। সাথে সাথে দোকানদার মেয়েটির প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে যেয়ে মেয়েটির হাত ধরেন। একই সাথে নারী শিক্ষার্থীর সাথে অশালীন ইঙ্গিত দিয়ে উত্ত্যক্ত করেন। বিষয়টি শিক্ষার্থী তার সহপাঠীদের জানালে তারা মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় দোকানদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে যান। এক পর্যায়ে দোকানদারের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা হয় এবং শিক্ষার্থীরা দোকানদারকে মারধর করেন। এর জেরে স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে স্থানীয়রা মাইকে ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলার জন্য এলাকাবাসীকে ডাকে। সংঘর্ষ চলাকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের ধাওয়া পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে ক্যাম্পাস এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী। এ সময় ক্যাম্পাসের এক সাংবাদিকের সাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। সংঘর্ষ শুরু হওয়ার তিন ঘণ্টা পরেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে না পৌঁছানোয় শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়ে। পরে উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও প্রক্টোরিয়াল টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে উভয় পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। রাত ৯টার পর সেনা সদস্য ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার পরিদর্শন করেন উপাচার্য, ট্রেজারারসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
কেমিকৌশল বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, উত্ত্যক্তের বিষয়টি জানতে পেরে তারা দোকানদারের কাছে প্রশ্ন করতে গেলে স্থানীয়দের বড় একটি দল তাদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পিছন থেকে ইট নিক্ষেপ করে। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দ্রুত বিচারের দাবিতে চৌগাছা–যশোর সড়কে টায়ার বেঞ্চ জ্বালিয়ে দিয়ে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষকেও অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা।
এদিকে দেরিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মজিদ ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. হোসাইন আল মামুনের পদত্যাগ দাবি প্রায় চার ঘন্টা তাদের অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে রাত দেড়টার দিকে জড়িতদের বিচারের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষকে ছেড়ে দেন।
বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যবিপ্রবির ক্যাম্পাসে যেয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণা অনেক কম। পরীক্ষা ক্লাস বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম করতে দেখা গেছে। আহতদের কয়েকজন ক্যাম্পাসের আর এম খান মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। আবার কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। সংঘর্ষের ঘটনাস্থল আমবটতলা বাজার বুধবার হাটের দিন থাকলেও অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। সড়কের উপর এখন ইট পাটকেল পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
কয়েকজন দোকানদার নাম না প্রকাশে বলেন, ‘কোন দোকানদার চায় না; শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঝামেলা করতে। কারণ শিক্ষার্থীরাই এসব দোকানদারের ক্রেতা। কিন্তু শিক্ষার্থীরা দু দফা তাদের এক দোকানদারকে মারধর করেছে। আমরা মুনায়েমের পক্ষে ক্ষমা চেয়েছি। তার পরেও মারধর করায় দোকানদাররা ক্ষিপ্ত হয়ে যায়।’ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ‘আমরা ক্যাম্পাসের বাইরে যেতে পারছি না। আমবটতলাতে গেলে তারা আমাদের উপর হামলা চালাতে পারে। আমরা নিরাপত্তার শঙ্কায় রয়েছি।’
এই বিষয়ে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমাদের প্রক্টরিয়াল বডিসহ অনেকে শিক্ষক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসতে দেরি করায় পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যায়। সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী আতংকিত ও আহত তাই বুধবার ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়েছে। শনিবার থেকে নিয়মিত ক্লাস চলবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের উপর এলাকাবাসীর হামলা; এটা নিন্দানীয়। আমরা বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং বাজার কমিটির সঙ্গে বসে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই বিষয়ে আলোচনা করবো।’
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার বলেন, ‘এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। একটি মামলায় অভিযুক্ত দোকানিকে আটক করা হয়েছে। কোন নিরঅপরাধ ব্যক্তিকে আটক করা হবে না। ঘটনাস্থলে পুলিশ টহল অব্যহত রেখেছে।’
Leave a Reply