মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে দুই ফুটফুটে কন্যা সন্তান মেহেরীন ও নওরীন। চার মাস বয়সী যমজ দুই কন্যাসন্তান এখনো বোঝেনি পৃথিবীর জটিলতা, বোঝেনি তাদের ঘিরে তৈরি হওয়া নির্মম বাস্তবতাকে। কিন্তু তাদের মায়ের চোখের ঘুম উবে গেছে স্বামীর তালাকে। রীনা খাতুনের শুধু একটি প্রশ্নই ”কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া কি অপরাধ?”
যেই সন্তানদের পৃথিবীর আলো দেখানোর পর এক মায়ের বুক গর্বে ভরে ওঠার কথা ছিল, সেই সন্তানদের জন্ম দেওয়াই আজ রীনার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘অভিশাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো অপরাধ না করেই স্রেফ কন্যাসন্তানের মা হওয়ার কারণে রীনাকে পেতে হয়েছে নির্মম শাস্তি, যমজ কন্যা সন্তাদের জন্ম দেওয়ায় কপালে জুটেছে বিবাহবিচ্ছেদের (তালাক) নিষ্ঠুর চিঠি। আর এই নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পুরাতন কোলা গ্রামে।
তথ্য নিয়ে জানা গেছে, দেড় বছর আগে পারিবারিকভাবে মহেশপুরের সামন্তা বাজার এলাকার পুরাতন কোলা গ্রামের শহিদুণ ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের সাথে ঘর বেঁধেছিলেন রীনা। বিয়ের শুরুর দিনগুলো আর দশটা সাধারণ দম্পতির মতোই ছিল রঙিন। আনন্দের মাত্রা আরও বাড়ে যখন রীনা গর্ভবতী হন। কিন্তু সেই আনন্দ-জোয়ারে প্রথম আঘাত আসে সন্তান পেটে আসার পর।
এক রুটিন আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টে চিকিৎসকরা জানান, রীনার গর্ভে বড় হচ্ছে যমজ কন্যাসন্তান। আর এই খবরটিই রীনার সাজানো সংসারে কালবৈশাখী ডেকে আনে। কন্যাসন্তানের খবর জানার পর থেকেই স্বামী রাকিবুল ও শাশুড়ি শামসুন্নাহারের আচরণে রাতারাতি পরিবর্তন আসে। গত ১১ ফেব্রয়ারি রীনা খাতুন যমজ কন্যা সন্তান প্রবস করলে তার উপর নির্মমতা বেড়ে যায়।
শুক্রবার দুপুরে মহেশপুর থানায় উপস্থিত হয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসানকে রীনা জানান, “ওরা যখনই শুনলো দুটোই মেয়ে হবে, তখন থেকেই আমার ওপর মানসিক অত্যাচার শুরু হলো। ওরা আমাকে সাফ বলে দিয়েছিল ’দুইটাই মেয়ে সন্তান হলে এই সন্তান আমরা নেব না। যদি একটা ছেলে হতো, তবে মেনে নেওয়া যেত।’ নিজের সন্তানের প্রতি এমন ঘৃণা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।”
পুলিশের কাছে রীনা অভিযোগ করেন, মেয়ে সন্তান গর্ভে থাকার অজুহাতে তার ওপর নতুন করে শ্বশুরবাড়ির মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। সন্তানদের পৃথিবীর আলোয় আনার পরও মন গলেনি স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের। একপর্যায়ে নির্যাতন চরমে পৌঁছালে এবং কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার ‘অপরাধে’ রীনাকে তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে গত ২৫ এপ্রিল আইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) পাঠানো হয়।
যজম শিশু মেহেরীন ও নওরীনের নানি হালিমা খাতুন জানান, কোলের দুই অবুঝ শিশুকে নিয়ে তারা চরম অসহায়ত্ব, অর্থনৈতিক সংকট আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মা ও সন্তানদের জীবনের অধিকার ফিরে পেতে তিনি এই নিষ্ঠুর ঘটনার বিচার দাবী করেন।
বিষয়টি নিয়ে যজম শিশুর পিতা রাকিবুল ইসলাম তার মুঠোফোন জানান, কন্যা শিশু হওয়ায় আমি খুব খুশি ছিলাম। রীনা যে অপপ্রচার চালাচ্ছে সেটা মিথ্যা ও অসত্য। তিনি বলেন, বিয়ের একমাস তাদের ভালই কেটেছিল। তারপর থেকে সন্দেহ শুরু হয়। স্ত্রীর মোবাইলে হাত দিলে ঝগড়া করতো। এরমধ্যে স্ত্রীর গর্ভে সন্তান আসে। সেই সন্তান গর্ভে ৮মাস থাকতে সে গর্ভপাত ঘটাতে চাই। পরে জানতে পারি বিয়ে হলো রীনার ব্যবসা। আমার সঙ্গে বিয়ের আগে আরো চার জায়গায় সে বিয়ে করে। প্রতিটি জায়গা থেকে সে মোটা অংকের কাবিন হাতিয়ে নিয়ে চলে আসে। আমার সঙ্গেও সে ৩ লাখ টাকার কাবিন করে।
রাকিবুল ইসলাম আরো জানান, আমি তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দ্ইু মাসের কোলের শিশু রেখে রীনা অন্য ছেলের সঙ্গে মটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ায়। এটা আমার ভালো লাগেনি। আমি তাকে আমার বাড়ি আনতে গেলে সে বলে “আমি মা ছাড়া (শ্বাশুড়ি) যাব না”। পরে জানতে পারি তার মা হালিমা খাতুনের সঙ্গেও তার পিতার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। রাকিবুল ইসলাম দাবিী করেন রীনার গোটা পরিবার প্রতারক ও কাবিন নিয়ে ব্যবসা করে। তাকে বিয়ে করে আমি নিজেই ফেঁসে গেছি বলে রাকিবুল ইসলাম দাবী করেন।
বিষয়টি নিয়ে মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান শুক্রবার দুপুরে জানান, যমজ শিশুটির মা ও নানিকে থানায় ডেকেছিলাম। তারা পরো ঘটনাটি জানিয়েছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে যখন নারীরা দেশ ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তখন কন্যাসন্তানের কারণে এক মাকে এমন সামাজিক ও পারিবারিক লাঞ্ছনার শিকার আইনগত ভাবে নির্মুল করা হবে। ওসি জানান, পুরো ঘটনাটি পুলিশ সুপারকে অবগত করানো হয়েছে। এখন যজম সন্তানের পিতা রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে দুই পক্ষের অভিযোগের সত্যতা বিশ্লেষন করা হবে।