যশোরের ছোট্ট হাফেজ জোবায়ের হোসেন আর নেই। দীর্ঘদিন বিরল রক্তরোগ অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার সঙ্গে লড়াই করে রোববার (৫ জুলাই) সকাল ৭টার দিকে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে সে। তার মৃত্যুতে পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকার মোহাম্মাদিয়া হাফিজিয়া কওমি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল জোবায়ের। সবার কাছে সে ছিল ‘কোরআনের পাখি’। মাত্র সাড়ে তিন মাস আগেও যে শিশুটি স্বাভাবিকভাবে কোরআন মুখস্থ করছিল, বন্ধুদের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কাটাচ্ছিল, হঠাৎ করেই ধরা পড়ে তার শরীরে বাসা বেঁধেছে বিরল রক্তের রোগ অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি মাসে প্রায় ৪২ হাজার টাকার চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল। ভ্যানচালক বাবা মুজাম্মেল হোসেনের পক্ষে সেই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারপরও ছেলেকে বাঁচাতে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন তিনি। রাতদিন নিউজসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সবাই বিশ্বাস করেছিল, একদিন সুস্থ হয়ে আবার কোরআনের ক্লাসে ফিরবে জোবায়ের। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন।
শনিবার দিবাগত রাতে হঠাৎ করেই জোবায়েরের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ছেলেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে বাবা-মা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়ান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়। কিন্তু সেই যাত্রা আর শুরু করা হলো না। রোববার সকাল ৭টার দিকে মায়ের কোল ছেড়ে চিরবিদায় নেয় ছোট্ট জোবায়ের।
জোবায়েরের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক ও সহপাঠীরা। যে শিশুর কণ্ঠে প্রতিদিন কোরআনের তিলাওয়াত শোনা যেত, আজ তার নীরবতায় স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো এলাকা।
জোবায়েরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সন্তান হারানোর বেদনা নয়; এটি একটি স্বপ্নের অপূর্ণ থেকে যাওয়ার গল্প। অসংখ্য মানুষের দোয়া, ভালোবাসা আর সহযোগিতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানতে হলো কোরআনের এই ক্ষুদে শিক্ষার্থীকে। আল্লাহ যেন ছোট্ট হাফেজ জোবায়েরকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই শোক সইবার শক্তি দান করেন—এমন দোয়া করছেন এলাকাবাসী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।