বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন দীর্ঘ তিন মাসের নীরবতা কেটে আবারও কোলাহল ও কর্মচাঞ্চল্যে ফিরে আসছে। গত ১ লা জুন থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর হওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় ১ লা সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন জেলে ও পর্যটকরা। জেলেপল্লী গুলোতে ট্রলার মেরামত, জাল বুনন ও রসদ সংগ্রহের ব্যস্ততা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।
তবে বনের দরজা খোলার আনন্দের পাশাপাশি বনদস্যুদের উৎপাত এবং অসাধু চক্রের বিষ দিয়ে মাছ শিকারের আশঙ্কা জেলেদের চিন্তায় ফেলছে। প্রতিবছর বন পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১ লা জুন থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের সব ধরনের জলজ ও বনজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রাখে বনবিভাগ।
এ সময় প্রজনন মৌসুম বন্যপ্রাণী ও মাছের বংশবৃদ্ধি নির্বিঘ্ন করতে এবং বনের ইকোসিস্টেম পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই এ তিন মাসের অবরোধ জারি করা হয় বলে জানা গেছে। ৩১আগস্ট সোমবার সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন সোনাতলা, জলের ঘাট, খুড়িয়াখালী, বগী, উত্তর সাউথখালী, রায়েন্দা রাজৈর মৎস্য আড়ৎঘাট, তজুমিয়ার গেট সহ বিভিন্ন জেলেপল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, নদী ও খালের পাড়ে প্রস্তুতি পর্ব প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।
দীর্ঘদিন পর প্রিয় পেশায় ফিরতে পেরে উপকূলীয় এলাকার মানুষগুলোর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বনদস্যু ও মুক্তিপণ আদায়কারীদের পুরোনো ভীতি তাদেরকে কিছুটা চিন্তিত করেছে। সুন্দরবনসংলগ্ন খুড়িয়াখালী, বগি ও উত্তর সাউথখালী গ্রামের জেলে খলিল হাওলাদার, জলিল হাওলাদার, খালেক হাওলাদার, রুবেল খান, ইউনুস হাওলাদার ও তানজের বয়াতী বলেন, সুন্দরবন সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত না হলে নদী-খালে নিরাপদে টিকে থাকা কঠিন।
জীবন আর জীবিকার তাগিদে বনে তো যেতেই হয়, তবে গভীর বণে অপহরণ ও মুক্তিপণের ভয় আমাদের তাড়া করে ফিরছে। বনজীবীরা নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বনরক্ষী দের টহল ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি ছাড়াও অবমুক্ত বনের সামনে বড়ো হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে অসাধু চক্রের “বিষ দিয়ে মাছ শিকার”।
সুন্দরবন সুরক্ষা বিষয়ক সংগঠন ‘ওয়াইল্ড টিম’-এর শরণখোলা উপজেলা ফ্যাসিলেটেটর মো. আলম হাওলাদার জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে কিছু অসাধু জেলে ব্যবসায়ীদের মদদে খালে বিষ ঢেলে দ্রুত বেশি মাছ আহরণের চেষ্টা করে। এই বিষাক্ত জলে শুধু নির্দিষ্ট মাছই নয়, রেণু পোনা, কাঁকড়া থেকে শুরু করে পুরো মৎস্য সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়।
এদিকে দীর্ঘদিন পর বনের দরজা খোলায় উচ্ছ্বসিত পর্যটক ও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা স্টেশন এলাকার টুরিস্ট গাইড মো. রাসেল বয়াতি জানান, তিন মাস ভ্রমণ বন্ধ থাকার পর সুন্দরবনের সতেজ ও প্রাকৃতিকভাবে নব রূপ দেখতে পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেকে সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য পর্যটক বাহি লঞ্চ ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করার বিষয় তাদের কাছে তথ্য চেয়েছে।
তবে বনজ সম্পদ ও জলজ প্রাণী রক্ষায় সতর্ক অবস্থানে থাকার বার্তা দিয়েছে বনবিভাগ ও কোষ্টগার্ড। পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা, অবৈধভাবে প্রবেশ বা দস্যুতার মতো যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বন বিভাগ। বনের ভেতরে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।