ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে প্রায় ১৬ মাস স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একসঙ্গে বসবাসের পর ধর্ষণ ও নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলায় রবিউল ইসলাম রবি (২৬) নামে এক ভ্যানচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আদালতের নির্দেশে মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঘটনাটি নিয়ে একদিকে বাদীপক্ষের গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে আসামিপক্ষের ভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। ফলে কথিত বিয়ে, একসঙ্গে বসবাস, বয়স এবং মামলার অভিযোগ—সবকিছু নিয়েই তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
ঘটনাটি কালীগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর বারোবাজার ইউনিয়নের লুচিয়া গ্রামের।মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে ইতি খাতুনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে রবিউল ইসলাম রবির পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাদীর অভিযোগ, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট কালীগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।পরে রবির বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাসের সময় বিয়ের কাবিননামা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাইলে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে রবির বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। ঘটনার পর ইতি খাতুন ঝিনাইদহ আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি কালীগঞ্জ থানায় এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।পরে ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে কালীগঞ্জ থানায় মামলাটি ১১ নম্বর মামলা ও জিআর-১৭১/২৬ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর ২৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ১টার দিকে বারোবাজার পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল লুচিয়া গ্রামে রবির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।
রবির পরিবারের দাবি দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে তাদের দাবি, ফেসবুকে পরিচয়ের পর রবি ও ইতির মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিষয়টি দুই পরিবারই জানত। পরে উভয় পরিবারের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ইতির বাবার বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়। শুকুর আলীর দাবি, মেয়েটির বয়স কম হওয়ায় আইনি জটিলতার আশঙ্কায় কাবিননামা করা হয়নি। স্থানীয় একজন ধর্মীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ইসলামী রীতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।এরপর রবি ও ইতি প্রায় ১৬ মাস স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে সংসার করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি। শুকুর আলী বলেন, আমরা গরিব মানুষ।
বাবা-ছেলে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। আমার ছেলের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।রবির পরিবারের পক্ষ থেকে কথিত বিয়ের অনুষ্ঠানের একাধিক ছবি এবং বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে রবি ও ইতির একসঙ্গে তোলা ছবি দেখানো হয়েছে।পরিবারের দাবি, এসব ছবি তাদের একসঙ্গে সংসার করার বিষয়টি প্রমাণ করে। তবে ছবিগুলোর তারিখ, স্থান ও ডিজিটাল তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ দাবি করেন, তিনি কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে রবির বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে গিয়েছিলেন। রবির বন্ধু রনির দাবি, প্রায় ৫০ জন বরযাত্রী নিয়ে তারা সেখানে গিয়েছিলেন এবং দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছিল।
অন্যদিকে ইতির পরিবারের পক্ষ থেকেও দুই এলাকায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়েছে।ইতির বড় বোন পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, তাদের এলাকায় এবং রবির বাড়ির এলাকাতেও বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল। তবে তাদের হাতে কোনো কাবিননামা বা বিয়ের কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। তার অভিযোগ, রবি তার ছোট বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ান এবং পরে রবির পরিবারের সদস্যরা তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এরপর তারা আদালতের আশ্রয় নেন। ইতির সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক বিষয় উল্লেখ করে এ বিষয়ে আর কথা বলতে চান না বলে জানান।
মামলার ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো ইতির বয়স।পরিবারের দেওয়া জন্মনিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, ইতির বর্তমান বয়স ১৫ বছর ১ মাস। তবে মামলার এজাহারে তার বয়স ১৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বয়স, ঘটনার সময়কাল এবং কথিত বিয়ের আইনগত অবস্থান সবকিছুই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, ইতি খাতুন আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করলে আদালত সেটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলা নথিভুক্ত করে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।বাদীর বয়সের বিষয়ে তিনি বলেন, বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।