রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় আবারও পিছিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেফটি ভালভে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কবে নাগাদ সমস্যার সমাধান হবে এবং কখন প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে—এ বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না সরকার।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভালভ দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণ করতে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ত্রুটির প্রকৃত কারণ জানা যাবে।প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ ভালভ দুটি সম্পূর্ণ পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ থাকা ভালভ প্রথম ইউনিটে স্থাপন করা অথবা রুশ ভেন্ডরকে নতুন ভালভ তৈরি করে দ্রুত সরবরাহের অনুরোধ করা। যে বিকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটিই বেছে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রূপপুর কেন্দ্রের সেফটি ভালভ নিয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত সেগুলো প্রয়োজনীয় মান পূরণ করতে পারেনি। ত্রুটি সমাধানের জন্য নতুন করে পরীক্ষা চালানোর পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়ার চেষ্টা চলছে।তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অত্যাধুনিক সেফটি ভালভ মূলত ইউক্রেন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি হয়। শুরুতে ইউক্রেনে ভালভ তৈরির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে পরে তুরস্ক থেকে ভালভ সংগ্রহ করা হয়।
নতুন করে ভালভ তৈরি করে আনতে হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালুর সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ এ ধরনের যন্ত্র তৈরি ও সরবরাহ করতে সাধারণত ছয় থেকে আট মাস সময় লাগে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি সময় প্রয়োজন হয়।পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেফটি ভালভ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কুলিং সিস্টেমে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হলে ভালভটি খুলে অতিরিক্ত চাপ বের করে দেয়। এতে যন্ত্রপাতি ও পাইপলাইনে অতিরিক্ত চাপজনিত ক্ষতির ঝুঁকি কমে।
সেফটি ভালভের ত্রুটি সমাধান হলেও প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে আরও কয়েক ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। ভালভ কার্যকর হওয়ার পর রিঅ্যাক্টরে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হবে। এরপর পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করতে আরও অন্তত আট থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পরও কয়েক মাস পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা চলবে।
পরমাণু শক্তি কমিশনের দুই কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বর্তমান অগ্রগতি বিবেচনায় এ বছর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর ফলে গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে দেশের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে গ্যাস ও তরল জ্বালানির ওপর চাপ কমার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতে ব্যয়ও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।মূল সময়সূচি অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট ২০২২ সালের ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৩ সালের অক্টোবরে চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের সময়সূচি কয়েক দফা পিছিয়েছে।চলতি বছর প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও দুটি সেফটি ভালভের ত্রুটির কারণে সেই লক্ষ্যও এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।