শান্তিতে নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ব্যবসার প্রসারে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে পুরস্কার তুলে দেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ঢাকায় পাওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন হলরুমে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও গবেষকসহ প্রায় ৪০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষণা করা হলে উপস্থিত অতিথিরা দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দিয়ে তাঁকে সম্মান জানান।এ বছর ড. ইউনূসসহ মোট চারজনকে এই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে। অন্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন ভারতের ‘সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (সেবা)-এর পরিচালক রিমা নানাবতী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও ‘টোরি বার্চ ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা টোরি বার্চ এবং জর্ডানের ‘মাইক্রোফান্ড ফর উইমেন’-এর বোর্ড চেয়ার মুনা সুখতিয়ান। মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ ‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাজের প্রশংসা করেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। এ ব্যাংকের মাধ্যমে নারীরা কীভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং ক্ষমতায়িত হয়েছেন, তা অভূতপূর্ব।হিলারি ক্লিনটন আরও বলেন, ড. ইউনূসের কাজ শুধু বাংলাদেশের নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাঁর উদ্যোগ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তব্যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর কাজের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই সম্মাননা তাঁদের দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রাণিত করবে। গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলা এবং নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই পালনের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
ড. ইউনূসের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রমের ফলে অনেক পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আগে যেসব নারী নিজেদের কথা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতেন, তাঁদের অনেকেই এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের সমস্যা ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরছেন। এসব নারী গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক এবং ব্যাংক পরিচালনায়ও তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।তরুণদের কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের সন্তানেরা এখন চাকরির সন্ধান করছেন। তবে তাঁদের প্রতি তাঁর আহ্বান—নিজেদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে না দেখে চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান তৈরির জন্য নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করা গেলে তাঁরা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন।বক্তব্যে সামাজিক ব্যবসার ধারণাও তুলে ধরেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, সামাজিক ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা।স্বাস্থ্যসেবা খাতে সামাজিক ব্যবসার তহবিলের সহায়তায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত অর্থ পুনরায় স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের মূলত চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তুলছে। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল, উদ্যোগী ও সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে তোলা।তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা, যাতে তরুণেরা নিজেদের ধারণা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।উদ্যোক্তাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশা প্রকাশ করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।তিনি বলেন, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ে তোলার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে।
এই ধারণার লক্ষ্য হলো শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণের মতো লক্ষ্য সামনে রেখে একটি নতুন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা।ড. ইউনূসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ অর্জনের পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করবে। ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র : বাসস